বিশেষ পোস্ট

হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণে ভিটামিনের ভূমিকা, নতুন গবেষণায় যা জানা গেছে

hypertension o vitaminer somporko notun gobeshona bangla
লাল শাকের ভিটামিন A, ভিটামিন B9 ও ভিটামিন K হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে

হাইপারটেনশন (উচ্চ রক্তচাপ) বিশ্বজুড়ে একটি অত্যন্ত সাধারণ ও গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ১২ কোটি মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক এই সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসা না করালে হাইপারটেনশন নীরবে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের কারণ হয়। একারণে একে নীরব ঘাতক বলা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই সুষম খাদ্যাভ্যাসকে হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে এসেছে এবং সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে- বিশেষ করে ভিটামিনের ভূমিকা নিয়ে।

গবেষণাটি যা নিয়ে

সায়েন্টিফিক রিপোর্টস নামক একটি পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় মালয়েশিয়াভিত্তিক ১০ জন গবেষকের একটি দল খাদ্যে ভিটামিন A, B6, B9, B12, C, E ও K গ্রহণের সাথে হাইপারটেনশনের সম্পর্ক পরীক্ষা করেছেন। গবেষণায় মালয়েশিয়ার ১০,০৩১ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়, যাদের মধ্যে ৪৩.৫ শতাংশের হাইপারটেনশন ছিল।

হাইপারটেনশনে আক্রান্তদের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে: বেশিরভাগের বয়স ৪০ বছরের বেশি, ওজন অতিরিক্ত বা স্থূলতার পর্যায়ে, তুলনামূলক নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং পরিবারে হাইপারটেনশনের ইতিহাস। গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও গত এক বছরে নির্দিষ্ট খাবার কতবার খেয়েছেন তা সম্পর্কে প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং মালয়েশিয়া ও মার্কিন কৃষি বিভাগের খাদ্য উপাদান তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে ভিটামিন গ্রহণের পরিমাণ নির্ণয় করেন।

ভিটামিন ও হাইপারটেনশনের সম্পর্ক

গবেষকদের মতে, পূর্ববর্তী গবেষণাগুলোও ভিটামিনের ঘাটতি ও হাইপারটেনশনের মধ্যে সম্পর্ক নিশ্চিত করেছে। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী- ভিটামিন সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম, রক্তনালী নিয়ন্ত্রণকারী উপাদান, ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার ও মূত্রবর্ধকের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। গবেষণা দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, ভিটামিন খুবই অল্প পরিমাণে প্রয়োজন হলেও সামগ্রিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণার মূল ফলাফল

গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণ মালয়েশিয়ান প্রাপ্তবয়স্কদের খাদ্যাভ্যাসে ভিটামিন A ও C এর মাত্রা মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল। তবে হাইপারটেনশনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নিম্নলিখিত ছয়টি ভিটামিন গ্রহণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম পাওয়া গেছে:

- ভিটামিন A

- ভিটামিন B6

- ভিটামিন B9 

- ভিটামিন B12

- ভিটামিন E

- ভিটামিন K

গবেষকদের মতে, এই পুষ্টিগত ঘাটতি হাইপারটেনশন এবং এর সাথে সম্পর্কিত জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

গবেষকরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, হাইপারটেনশনে আক্রান্ত রোগীদের শুধু ভিটামিন গ্রহণের দিকে মনোযোগ দিলেই চলবে না, নির্ধারিত ওষুধ সেবনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই গবেষণাটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা, অর্থাৎ এটি সরাসরি প্রমাণ করে না যে ভিটামিনের ঘাটতিই উচ্চ রক্তচাপের কারণ- বরং এটি একটি সম্পর্ক নির্দেশ করে, যার পেছনে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় প্রভাব

গবেষক দলের পরামর্শ অনুযায়ী, চিকিৎসকদের হাইপারটেনশন ম্যানেজমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রোগীর পুষ্টিগত অবস্থাকে বিবেচনায় নেয়া উচিত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরামর্শ দেয়া যেতে পারে, যাতে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ফলাফল উন্নত হয়।

এসব ভিটামিন পাবেন যেখানে 

এখানে উল্লেখিত সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, হাইপারটেনশনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্যাভ্যাসে ভিটামিন A, B6, B9, B12, E এবং K গ্রহণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। সুখবর হলো, এই ভিটামিনগুলোর বেশিরভাগ উৎসই বাংলাদেশের বাজারে সহজলভ্য ও সস্তা। এসব খাবার নিয়মিত খেলে হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

ভিটামিন A : গাজর, মিষ্টি আলু, কুমড়া, পাকা পেঁপে, পালং শাক, লাল শাক, কলমি শাক, ডিমের কুসুম, গরু-খাসির কলিজা, দুধ ও আমে ভিটামিন A পাবেন। কুমড়া প্রায় সারাবছরই পাওয়া যায় ও দামে সস্তা। গ্রামাঞ্চলে লাল শাক, কলমি শাক সহজলভ্য ও কম খরচে পাওয়া যায়।

ভিটামিন B6 : মুরগির মাংস, বিভিন্ন দেশি মাছ (রুই, কাতলা, ইলিশ), আলু, ছোলা ও কলায় ভিটামিন B6 পাবেন। আলু বাংলাদেশের প্রায় নিত্যদিনের খাবারের অংশ, তাই খাদ্যাভ্যাসেই এই ভিটামিন কিছুটা পাওয়া যায়। কলা সারাবছর সহজলভ্য একটি ফল।

ভিটামিন B9 : পালং শাক, লাল শাক, মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলার ডাল, কমলা ও মাল্টায় ভিটামিন B9 (ফোলেট) পাবেন। ডাল বাংলাদেশি খাদ্যতালিকার একটি নিয়মিত অংশ, তাই এখান থেকে ফোলেট পাওয়া তুলনামূলক সহজ। শীতকালে বিভিন্ন শাকসবজির সরবরাহ বাড়ে, তখন এসব খাবার বেশি করে খেতে পারেন।

ভিটামিন B12 : দেশি মাছ (বিশেষত রুই, কাতলা, পাঙ্গাস, ইলিশ, টুনা), মাংস, ডিম, দুধ ও দইয়ে ভিটামিন B12 পাবেন। মাছ বাংলাদেশের প্রধান প্রোটিন উৎস হওয়ায় নিয়মিত মাছ খাওয়ার অভ্যাস থাকলে ভিটামিন B12 এর ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা কম। যারা নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন বা মাছ-মাংস কম খান, তাদের ভিটামিন বি12 এর ঘাটতি হতে পারে- প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নেয়া যেতে পারে।

ভিটামিন E : সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, পালং শাক, সূর্যমুখীর বীজ ও চিনাবাদামে ভিটামিন E পাবেন। সরিষার তেল বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রান্নার একটি প্রধান উপাদান, যা ভিটামিন E এর একটি ভালো উৎস। চিনাবাদাম সহজলভ্য ও সস্তা স্ন্যাকস হিসেবে জনপ্রিয়।

ভিটামিন K : পালং শাক, লাল শাক, কলমি শাক, বাঁধাকপি ও মটরশুঁটিতে ভিটামিন K পাবেন। বিভিন্ন ধরনের শাক বাংলাদেশের খাদ্য সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং স্থানীয় বাজারে খুবই সস্তা ও সহজলভ্য।

শেষ কথা

এই গবেষণা হাইপারটেনশন ম্যানেজমেন্টে সুষম খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বকে আরও একবার তুলে ধরে, বিশেষত ভিটামিন A, B6, B9, B12, E ও K সমৃদ্ধ খাবারের ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করে। তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে ভিটামিন গ্রহণ কোনোভাবেই নির্ধারিত ওষুধের বিকল্প নয়, বরং সামগ্রিক চিকিৎসার একটি সহায়ক অংশ হতে পারে। হাইপারটেনশন থাকলে খাদ্যাভ্যাসে কোনো বড় পরিবর্তন আনার আগে একজন চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

Comments