বিশেষ পোস্ট

পুরুষ হরমোন সম্পর্কে যা জানা প্রয়োজন

purush hormone testosterone bangla
রোদের সংস্পর্শে পুরুষ হরমোন বাড়ে

পুরুষের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার মূল চাবিকাঠি হলো পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন (Testosterone)। এটি প্রধানত পুরুষের অণ্ডকোষ (Testicles) থেকে উৎপন্ন হয়। সামান্য পরিমাণ টেস্টোস্টেরন নারীদের শরীরেও তৈরি হয়, তবে পুরুষের তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য।

টেস্টোস্টেরনকে বলে Male Power Hormone. এটা কেবল পেশি আর যৌনতার জন্য নয়; পুরুষের শক্তি, মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস, চর্বি কমানো- সবকিছুর পেছনে এটা। একটি ছেলের বয়ঃসন্ধিকাল থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া এবং পুরো জীবন জুড়ে পেশিবহুল শরীর, কণ্ঠস্বরের গাম্ভীর্য, দাড়ি-গোঁফ এবং প্রজনন ক্ষমতা বজায় রাখতে হরমোনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

পুরুষ হরমোনের কাজ

টেস্টোস্টেরন কেবল একটি সেক্স হরমোন নয়, এটি পুরুষের পুরো শরীরের পাওয়ার হাউস হিসেবে কাজ করে। এখানে হরমোনটির প্রধান কাজসমূহ উল্লেখ করা হলো।

১। প্রজনন স্বাস্থ্য ও শুক্রাণু উৎপাদন: সুস্থ প্রজনন ক্ষমতা এবং মানসম্মত শুক্রাণু তৈরির জন্য টেস্টোস্টেরন অপরিহার্য। পুরুষের সুস্থ যৌন আকাঙ্ক্ষার প্রধান নিয়ামক এটি। পুরুষের বিছানার পারফরম্যান্স এই হরমোনের উপর অনেকাংশ নির্ভর করে। তবে এটি সরাসরি পারফরম্যান্সের সময়/স্থায়িত্ব বাড়ায় না। স্বাস্থ্য বিষয়ক সাইট হেলথলাইনে বলা হয়েছে, টেস্টোস্টেরন মূলত মানুষের মস্তিষ্কে যৌন উদ্দীপনা জাগাতে এবং শরীরকে মিলনের জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে।

২। পেশি ও হাড়ের ঘনত্ব: পুরুষ হরমোন প্রোটিন সংশ্লেষণ বাড়িয়ে পেশির ভর বৃদ্ধি করে এবং হাড়ের ক্যালসিয়াম ধরে রেখে হাড় মজবুত করে। হসপিটাল ফর স্পেশাল সার্জারি'র সাইটে বলা হয়েছে, টেস্টোস্টেরন শরীরে চর্বির পরিমাণ কমিয়ে পেশির ঘনত্ব বজায় রাখে। এটি বোন মিনারেল ডেনসিটি বা হাড়ের ভেতরের ঘনত্ব বাড়াতে সরাসরি কাজ করে, ফলে বয়সজনিত হাড়ের ক্ষয় ও ভেঙ্গে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।

৩। চর্বি নিয়ন্ত্রণ:  পুরুষ হরমোন শরীরে চর্বির বিপাক ক্রিয়া (Fat Metabolism) নিয়ন্ত্রণ করে, যা অতিরিক্ত চর্বি জমতে বাধা দেয়। টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে শরীরে চর্বি (বিশেষ করে পেটের চর্বি) জমার প্রবণতা বাড়ে। আবার বিপরীতভাবে, শরীরের অতিরিক্ত চর্বি টেস্টোস্টেরন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। তাই চর্বি নিয়ন্ত্রণ এবং টেস্টোস্টেরনের ভারসাম্য বজায় রাখা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হরমোনটি পেশীর ঘনত্ব বাড়িয়ে বিশ্রামের সময়ও শরীরের ক্যালরি পোড়াতে সাহায্য করে।

৪। রক্ত সঞ্চালন: পুরুষ হরমোন ও রক্ত সঞ্চালন একে অপরের সাথে জড়িত। হরমোনটি অস্থিমজ্জাকে লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে উদ্দীপিত করে, যা রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়। ফলে হার্টের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। মেডিকভার হসপিটালসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, পুরুষের লিঙ্গ উত্থান (ইরেকশন) রক্ত সঞ্চালনের ওপর নির্ভরশীল; টেস্টোস্টেরন রক্তনালী প্রসারিত করে যৌনাঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত প্রবাহে সাহায্য করে। 

৫। মানসিক সুস্থতা: পুরুষের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, মেজাজ এবং পুরুষালি আত্মবিশ্বাস সরাসরি টেস্টোস্টেরনের ওপর নির্ভরশীল। শরীরে পর্যাপ্ত টেস্টোস্টেরন থাকলে মস্তিষ্কে 'সেরোটোনিন' ও 'ডোপামিন' পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপন্ন হয়। এসব ফিল-গুড হরমোন বিষণ্নতা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও মানসিক অস্থিরতা রুখে দিতে পারে। 

পুরুষ হরমোন কমার কারণ

সাধারণত বয়স ৩০ বছরের পর থেকে পুরুষদের শরীরে প্রতিবছর প্রায় ১% হারে টেস্টোস্টেরন প্রাকৃতিকভাবে কমতে থাকে। কিন্তু বর্তমানে জীবনযাপনে অসংগতির কারণে অনেক তরুণই অকালে বুড়া হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ শরীরে পুরুষ হরমোনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এখানে পুরুষ হরমোন কমে যাওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণগুলো উল্লেখ করা হলো।

১। অতিরিক্ত মানসিক চাপ: দীর্ঘসময় মানসিক চাপে থাকলে শরীর কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে, যা টেস্টোস্টেরন উৎপাদন বিঘ্নিত করে।

২। অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার:  অতিরিক্ত ফাস্টফুড, চিনি, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও কোমল পানীয়ের মতো খাবার খেলে প্রয়োজনীয় পুষ্টির (যেমন- জিঙ্ক, ভিটামিন ডি এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি) অভাবে পুরুষ হরমোন কমে যায়।

৩। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: অলস জীবনযাপন পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। লো টি সেন্টার নামক সাইটে বলা হয়েছে- শারীরিক পরিশ্রম না করলে শরীরে চর্বি জমে এবং কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন বাড়ে, যা সরাসরি টেস্টোস্টেরন উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে।

৪। অতিরিক্ত ওজন: শরীরের অতিরিক্ত চর্বি পুরুষ হরমোনকে নারী হরমোন এস্ট্রোজেন-এ রূপান্তর করে ফেলে।অতিরিক্ত ওজনের কারণে শরীর ইনসুলিন হরমোন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। এই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সরাসরি অণ্ডকোষে টেস্টোস্টেরন উৎপাদন কমিয়ে দেয়।

৫। ঘুমের অভাব: ঘুমের ঘাটতি পুরুষ হরমোনের মাত্রা দ্রুত ও মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের শরীরে দৈনিক টেস্টোস্টেরন হরমোনের সিংহভাগই তৈরি হয় রাতে ঘুমানোর সময়। যদি কোনো পুরুষ টানা এক সপ্তাহ মাত্র ৫ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমায়, তবে তার টেস্টোস্টেরনের মাত্রা প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে!

৬। মাদক ও ধূমপান: মাদক গ্রহণ ও ধূমপান পুরুষ হরমোন কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। তামাক, অ্যালকোহল এবং অন্যান্য মাদক সরাসরি পুরুষের প্রজননতন্ত্র ও হরমোন উৎপাদনকারী গ্রন্থিগুলোকে আক্রমণ করে। মাদক লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে। লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তখন এটি পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরনকে নারী হরমোন এস্ট্রোজেন-এ রূপান্তর করা শুরু করে। সিগারেটের নিকোটিন ও ভারী ধাতু (যেমন ক্যাডমিয়াম) অণ্ডকোষের লেডিগ কোষ ধ্বংস করে দেয়, যা টেস্টোস্টেরন তৈরির একমাত্র উৎস।

পুরুষ হরমোন প্রাকৃতিকভাবে বাড়ানোর উপায়

জীবনধারায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনে প্রাকৃতিকভাবে পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন লেভেল বাড়ানো সম্ভব। এখানে টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক উপায় উল্লেখ করা হলো।

১। পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘন্টা গভীর ঘুম হরমোন উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। রাত ১০-১১টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তে পারেন। রুম সম্পূর্ণ অন্ধকার করুন। ফোন দূরে রাখুন। এভাবে ৫০% কাজ হয়ে যাবে।

২। ভারী ব্যায়াম: ভারী ব্যায়াম পুরুষের প্রধান হরমোন টেস্টোস্টেরন এবং গ্রোথ হরমোন বৃদ্ধিতে সরাসরি সহায়তা করে। জিম বা বাড়িতে ওয়েট লিফটিং এবং হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং করতে পারেন। ভারী ওজন তুললে ব্রেইন সিগন্যাল দেয় 'টেস্টোস্টেরন বানাও'। সপ্তাহে ৩ দিন যথেষ্ট হতে পারে।

৩। জিংক ও ভিটামিন ডি: ডিম, গরুর গোশত, কলিজা, চর্বিযুক্ত মাছ, বাদাম, কুমড়োর বীজ এবং দুধ খাদ্যতালিকায় রাখুন। ডিমের কুসুমের স্বাস্থ্যকর চর্বি ও ভিটামিন ডি হরমোন তৈরির কাঁচামাল। সবুজ শাকসবজিতে (বিশেষ করে পালং শাক, ব্রকলি ও বাঁধাকপি) থাকা 'ইন্ডোল-৩-কার্বিনল' শরীর থেকে বাড়তি এস্ট্রোজেন বের করে দেয়। প্রতিদিন সকালে মধু ও কালোজিরা খেলে টেস্টোস্টেরন বুস্ট হবে। 

৪। রোদের সংস্পর্শ: ভিটামিন ডি একটি প্রাকৃতিক টেস্টোস্টেরন বুস্টার। প্রতিদিন সকালে ১৫-২০ মিনিট শরীরে রোদ লাগান। ১০টা থেকে ১২টার রোদ সবচেয়ে ভালো। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ডি৩ সাপ্লিমেন্ট নিতে পারেন।

৫। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: যোগব্যায়াম, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, মেডিটেশন বা শখের কাজ করার মাধ্যমে মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকুন। কারণ, মানসিক চাপের হরমোন বাড়লে টেস্টোস্টেরন কমে যায়। 

৬। ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের অতিরিক্ত ওজন বিএমআই অনুযায়ী কমিয়ে আনুন। অতিরিক্ত ওজনের কারণে শরীরে টেস্টোস্টেরন কমে নারী হরমোন এস্ট্রোজেন বেড়ে যেতে পারে। পেটের চর্বিতে অ্যারোমাটেজ থাকে, যা টেস্টোস্টেরনকে এস্ট্রোজেনে রূপান্তর করে। 

৭। কোল্ড শাওয়ার: ঠান্ডা পানি অণ্ডকোষে গেলে ব্রেইন LH হরমোন পাঠায়। LH গিয়ে লেডিগ কোষকে বলে, টেস্টোস্টেরন বানাও। সকালে ২-৩ মিনিট ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে পারেন। শুরুতে ৩০ সেকেন্ড থেকে শুরু করতে পারেন।

ডিসক্লেইমার: এখানে সাধারণ তথ্য দেয়া হয়েছে। হরমোন সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

Comments