বিশেষ পোস্ট

হাড়ের সুরক্ষায় তিন পুষ্টি

harer surokkhay vitamin d, calcium o phosphorus bangla
ডিমের কুসুমে রয়েছে হাড় সুরক্ষার পুষ্টি

শৈশবে হয়তো শুনেছেন, দুধ খেলে হাড় শক্ত হয়। এই পুরনো পরামর্শটা এখনো সমান প্রাসঙ্গিক, কারণ দুধে এমন কিছু ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকে যা হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। বয়সের সাথে সাথে হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে, যা অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ভাঙার মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষত মেনোপজের পর নারীদের ক্ষেত্রে মাত্র ৫-৭ বছরের মধ্যেই হাড়ের ঘনত্ব ২০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। পুষ্টিবিদদের মতে- বয়স, জীবনধারা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যই হাড়ের ঘনত্ব কমার প্রধান কারণ। তবে সুষম খাদ্যাভ্যাস, প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্ট এবং জীবনযাপনে পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ঘনত্ব কিছুটা বাড়ানো সম্ভব।

হাড়ের ঘনত্ব বেশি কমে গেলে চিকিৎসক ওষুধ বা প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিতে পারেন। সাপ্লিমেন্ট এসব চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক হতে পারে- তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে। এখানে হাড়ের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে এমন তিনটি পুষ্টি সম্পর্কে বলা হলো।

ভিটামিন ডি

হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিনগুলোর একটি হলো ভিটামিন ডি, কারণ এটি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণ ও হাড়ে খনিজ জমাতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো- এখানে পর্যাপ্ত রোদ থাকা সত্ত্বেও, বিশেষত শহরাঞ্চলে অফিসে কর্মরত মানুষ, পর্দানশীন নারী বা যারা দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরে কাটান, তাদের মধ্যে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি বেশ সাধারণ একটি সমস্যা।

সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে ১৫-২০ মিনিট রোদে থাকলে শরীর প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে। খাবারের মধ্যে ইলিশ ও রুই মাছের মতো তেলযুক্ত মাছ, ডিমের কুসুম ও দুধে ভিটামিন ডি পাবেন। সাপ্লিমেন্ট সেবন করলে ডোজের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ভিটামিন ডি একটি চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন, তাই অতিরিক্ত গ্রহণে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে। রক্ত পরীক্ষায় ঘাটতি নিশ্চিত হলেই কেবল চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট শুরু করা উচিত।

ক্যালসিয়াম

ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁত গঠন ও মজবুত রাখার প্রধান খনিজ উপাদান। এটি রক্ত জমাট বাঁধা এবং হৃদপিণ্ড, মাংসপেশি ও লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শরীরের প্রয়োজনে যখন রক্তে ক্যালসিয়াম কম পড়ে, তখন হাড় থেকে ক্যালসিয়াম নিঃসৃত হয়ে ঘাটতি পূরণ করে- এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন চললে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়। তাই প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম রাখা জরুরি। প্রাপ্তবয়স্কদের (১৯-৫০ বছর) জন্য দৈনিক প্রয়োজন সাধারণত ১০০০ মিলিগ্রাম, আর ৫১ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য তা বেড়ে ১২০০ মিলিগ্রাম হয়। বাংলাদেশে ক্যালসিয়ামের সহজলভ্য উৎস হলো- দুধ, দই, পনির, কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন ছোট (যেমন- মলা, ঢেলা ও কাচকি মাছ), সবুজ শাক, তিল ও তিলের তেল।

রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে (হাইপারক্যালসেমিয়া) সমস্যা হতে পারে, তাই সাপ্লিমেন্ট নেয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। খাবার থেকেই ক্যালসিয়াম পাওয়ার চেষ্টা করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

ফসফরাস

ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি এর তুলনায় ফসফরাস নিয়ে কম আলোচনা হলেও, এটিও হাড়ের স্বাস্থ্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ফসফরাস শরীরে ক্যালসিয়াম বিপাক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে- অর্থাৎ শরীর কীভাবে ক্যালসিয়াম শোষণ, পরিবহন ও ব্যবহার করে, তাতে ফসফরাসের ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশে ফসফরাসের সহজলভ্য উৎস হলো- দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, মাছ, মাংস, কলিজা, বাদাম ও ডাল।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের ওয়েবসাইট মেডলাইন প্লাসের তথ্যানুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক ফসফরাসের প্রয়োজন প্রায় ৭০০ মিলিগ্রাম। সাধারণ খাদ্যাভ্যাসেই এই চাহিদা মোটামুটি পূরণ হয়ে যায়, তাই আলাদা সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন সাধারণত কম মানুষের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। তবে প্রয়োজন মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।

সতর্কতা: বাংলাদেশের ফার্মেসিতে সহজেই ক্যালসিয়াম-ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট পাওয়া যায়, তবে না জেনে নিজে থেকে শুরু করার আগে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত, কারণ প্রয়োজনের বেশি গ্রহণে ক্ষতি হতে পারে।

শেষ কথা: হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস- এই তিনটি উপাদান একসাথে কাজ করে। সুখবর হলো, এগুলির অধিকাংশ উৎসই বাংলাদেশের খাদ্যতালিকায় সহজলভ্য। দুধ, ছোট মাছ, শাকসবজি ও নিয়মিত রোদে থাকার অভ্যাস দিয়েই অনেকটা চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তবে হাড়ের ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বা অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি থাকলে সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে, যা একজন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে শুরু করা উচিত নয়।

Comments