বিশেষ পোস্ট

ভিকারিয়াস ট্রমা সম্পর্কে যা জানা প্রয়োজন

 

vicarious trauma bangla
অন্যের কষ্ট দেখে আপনিও অসুস্থ হচ্ছেন না তো?

ভিকারিয়াস ট্রমা কি?

অন্যের বিপদে এগিয়ে যাওয়া বা কারো দুঃখের গল্প শুনে খারাপ লাগা একটি স্বাভাবিক মানবিক গুণ। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন- অন্যের কষ্ট, নির্যাতন বা দুর্ঘটনার কথা বারবার শুনতে শুনতে আপনি নিজেও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন? চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই পরিস্থিতিকে বলা হয় ভিকারিয়াস ট্রমা (Vicarious Trauma) বা পরোক্ষ মানসিক আঘাত। এটাকে সেকেন্ড হ্যান্ড ট্রমাও বলে।

সহজ কথায়- কোনো একটি খারাপ ঘটনা আপনার সাথে সরাসরি ঘটেনি, কিন্তু ভুক্তভোগীর মুখ থেকে সেই ঘটনার বিবরণ বারবার শোনার কারণে আপনার নিজের মনের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তা-ই ভিকারিয়াস ট্রমা বলে। অনলাইনে দুর্ঘটনার ভিডিও দেখলে, যুদ্ধের ভয়াবহতা স্ক্রল করলে অথবা রোগীর কষ্টের কথা শুনলে এমনটা হতে পারে। আজকাল ডাক্তার, নার্স, সাংবাদিক, পুলিশ, ল'ইয়ার এমনকি সাধারণ আমরাও এই সমস্যায় ভুগছি।

অনেকেই সহানুভূতি (Empathy) এবং ভিকারিয়াস ট্রমাকে এক করে ফেলেন। তবে এদের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। সহানুভূতি হলো- অন্যের কষ্ট দেখে সাময়িকভাবে খারাপ লাগা এবং তাকে সাহায্য করতে চাওয়া। এটি মানুষের একটি ইতিবাচক গুণ। অন্যদিকে ভিকারিয়াস ট্রমা কোনো সাধারণ মন খারাপ নয়। এটি হলো অন্যের কষ্ট দেখতে দেখতে বা শুনতে শুনতে নিজের মনের ভেতর মানসিক বিপর্যয় তৈরি হওয়া। এর ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

ভিকারিয়াস ট্রমার লক্ষণ

এই সমস্যাটি মানুষের মনে ধীরে ধীরে বাসা বাঁধে। নিচে এর কিছু সাধারণ লক্ষণ দেয়া হলো:

মনের ওপর প্রভাব: সারাক্ষণ মন খারাপ বা বিষণ্ন থাকা, অল্পতেই অতিরিক্ত রেগে যাওয়া এবং চেনা মানুষদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া। 

শরীরের ওপর প্রভাব: তীব্র মাথা ব্যথা, বুক ধড়ফড় করা, সারাক্ষণ ক্লান্তি অনুভব করা, হজমের সমস্যা, ঘনঘন অসুস্থ হয়ে পড়া এবং রাতে ঠিকমত ঘুম না হওয়া।

আচরণে পরিবর্তন: কাজের প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং নিজেকে শান্ত রাখতে অতিরিক্ত চা-কফি বা ধূমপানের ওপর নির্ভর করা।

চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন: মনে হতে থাকে যে চারপাশের পৃথিবীটা খুব বিপজ্জনক এবং কোনো মানুষই বিশ্বাসযোগ্য নয়। তীব্র অপরাধবোধ হতে পারে যে, আমি বোধহয় কাউকেই সাহায্য করতে পারছি না।

যাদের ঝুঁকি বেশি

যারা পেশাগত বা ব্যক্তিগত কারণে প্রতিনিয়ত মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা শোনেন বা দেখেন তাদের ভিকারিয়াস ট্রমার ঝুঁকি বেশি। যেমন-

মানসিক ডাক্তার ও কাউন্সিলর: যারা সারাদিন মানুষের নানা কষ্টের কথা শোনেন।

ডাক্তার ও নার্স: বিশেষ করে যারা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বা আইসিইউতে কাজ করেন।

সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী: যারা যুদ্ধ, খুন, দুর্ঘটনা বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর সংগ্রহ ও এডিট করেন।

সমাজকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক: দুর্যোগ কবলিত এলাকায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিরা।

এই সমস্যা থেকে বাঁচার উপায়

অন্যকে সাহায্য করার আগে নিজের ভালো থাকাটা বেশি জরুরী। ভিকারিয়াস ট্রমা এড়াতে এই সহজ নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:

কাজের একটা সীমা রাখুন: অফিস বা কাজের সময় শেষ হওয়ার পর ট্রমার বিষয়গুলো আর ভাববেন না। পেশাদার জীবন ও ব্যক্তিগত জীবন আলাদা রাখুন।

সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার কমান: সারাক্ষণ অনলাইন বা নিউজে নেতিবাচক ও সহিংসতার খবর দেখা বন্ধ করুন। 

মন খুলে কথা বলুন: নিজের মানসিক চাপ বা খারাপ লাগার বিষয়টি সহকর্মী, বন্ধু বা পরিবারের মানুষের সাথে শেয়ার করুন। মনের কথা প্রকাশ করলে বোঝা হালকা হয়।

নিজের যত্ন নিন: প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ ঘন্টা ঘুমান, পুষ্টিকর খাবার খান এবং শরীর সতেজ রাখতে হালকা হাঁটাচলা বা ব্যায়াম করুন।

মন ভালো রাখার কাজ করুন: অডিও শোনা, বই পড়া, গাছ লাগানো বা পছন্দের জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার জন্য কিছুটা সময় বের করুন।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন: মানসিক চাপ নিজের নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কোনো দ্বিধা না করে একজন অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সিলরের সাহায্য নিন।

শেষ কথা

মানুষকে সাহায্য করা খুবই মহৎ কাজ। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি নিজে সুস্থ না থাকলে অন্যকে সুস্থ করতে পারবেন না। কাজের খাতিরে প্রতিনিয়ত মানুষের দুঃখের সাগরে ডুব দিতে হলেও সবার আগে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। ভিকারিয়াস ট্রমার লক্ষণ দেখা দিলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন। নিজের মনের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন।


Comments