বিশেষ পোস্ট

শিশুর পাঁচ নীরব ঘাতক

 

শিশুর নীরব ঘাতক সম্পর্কে জানা
আপনার শিশু সুস্থ আছে তো? 
(ছবিটি প্রতীকী)

শিশুর নীরব ঘাতক বলতে এমন কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা, রোগ ও অভ্যাসকে বোঝায় যা কোনো বড় ধরনের লক্ষণ ছাড়াই শিশুর শরীরে বাসা বাঁধে এবং ধীরে ধীরে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে ধ্বংস করে দেয়। অনেক সময় মা-বাবা টের পাওয়ার আগেই শিশুর অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। এখানে শিশুর পাঁচটি নীরব ঘাতক সম্পর্কে বলা হলো।

১। দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি: অপুষ্টি মানে কেবল রোগা হওয়া নয়। শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থাকলে শিশুর উচ্চতা ও বুদ্ধি বয়সের তুলনায় বাড়ে না। একে স্টান্টিং (Stunting) বা বামনত্ব/খর্বতা বলা হয়, যা বাইরে থেকে হঠাৎ বোঝা যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো বাচ্চার বয়স অনুযায়ী উচ্চতা যদি গড় উচ্চতার চেয়ে ২ স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন এর নিচে হয়, তখন তাকে স্টান্টেড বলা হয়। এটা ২ বছরের আগে হয়ে গেলে পরে আর সহজে ঠিক হয় না।

দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টিতে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা চিরতরে কমে যায় এবং ব্রেইনের সঠিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। বড় হলে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।

গর্ভবতী মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে এবং শিশুকে প্রথম ৬ মাস বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এরপর থেকে নিয়মিত পরিপূরক পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে, বিশেষ করে ঘরে প্রস্তুতকৃত খাবার।

২। স্থূলতা: অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড, প্রসেসড ফুডস এবং কোমল পানীয় খাওয়ার কারণে শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন বাড়ছে। এর হাত ধরে শিশুদের শরীরে ডায়াবেটিস বাসা বাঁধছে, যা সহজে ধরা পড়ে না। এর ফলে তারা অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ঘনঘন প্রস্রাব করে এবং অল্প বয়সেই কিডনি ও হার্টের সমস্যা দেখা দেয়।

শিশুকে ফাস্ট ফুড, চিপস-চকলেট ও অন্যান্য প্রসেসড ফুডস, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার খাওয়ানো কমাতে হবে। তাদেরকে প্রতিদিন শারীরিকভাবে সক্রিয় রাখতে হবে।

৩। জন্মগত হার্টের সমস্যা: অনেক শিশু হার্টে সামান্য ত্রুটি বা ছিদ্র নিয়ে জন্মায়। শিশুর জন্মগত হার্টের সমস্যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ (Congenital Heart Disease) বলা হয়। হার্টে জন্মগত সমস্যা থাকলে বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশু অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠে, ঠোঁট বা নখ নীল হয়ে যায় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে জীবনহানি হতে পারে।

শিশু মায়ের দুধ টানতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠলে-কপালে ঘাম জমলে-বারবার দুধ খাওয়া ছেড়ে দিলে, সমবয়সী অন্য শিশুদের তুলনায় ওজন ও উচ্চতা ঠিকমতো না বাড়লে, ঘনঘন ঠান্ডা লাগলে বা নিউমোনিয়া হলে, কান্নাকাটি করার সময় ঠোঁট-জিব-মুখ বা নখের চারপাশ নীল বা কালো হয়ে গেলে এবং একটু নড়াচড়া বা খেলাধুলা করলেই দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়লে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

৪। সুপ্ত যক্ষ্মা: শিশুরও যক্ষ্মা হতে পারে। এটি একটি গুরুতর সংক্রামক রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে যক্ষ্মার লক্ষণগুলি সহজে ধরা পড়ে না। সাধারণ ঠান্ডা-কাশি মনে করে মা-বাবা এটিকে অবহেলা করেন। শিশুর মধ্যে নিচের লক্ষণগুলি টানা দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় থাকলে যক্ষ্মা আশঙ্কা করা হয়-

° দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অবিরাম খুসখুসে কাশি, যা সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে কমে না।

° টানা হালকা জ্বর, বিশেষ করে বিকেলের দিকে বা রাতে শরীর হালকা গরম হওয়া (সাধারণত ১০০° ফারেনহাইটের কাছাকাছি)।

° পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো সত্ত্বেও শিশুর ওজন দিন দিন কমে যাওয়া বা বয়স অনুযায়ী ওজন না বাড়া।

° শিশু খেলাধুলা ছেড়ে সারাদিন ঝিমিয়ে থাকে, শুয়ে থাকতে চায় এবং খিটখিটে আচরণ করে।

° ঘাড়, বগল বা কুঁচকির লসিকাগ্রন্থি ব্যথাহীনভাবে ফুলে যাওয়া।

উপরের যেকোনো লক্ষণ দেখলে শিশুকে ডাক্তার দেখাতে হবে। সঠিক সময়ে রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা করালে যক্ষ্মার সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। এটা প্রতিরোধে জন্মের পরপরই শিশুকে বিসিজি (BCG) টিকা দিতে হবে, যা শিশুদের মারাত্মক ধরণের যক্ষ্মা (যেমন- টিবি মেনিনজাইটিস) থেকে রক্ষা করে। 

৫। ডিহাইড্রেশন ও নিউমোনিয়া: ডায়রিয়া এবং কাশিকে আমরা নরমাল ভাবি। কিন্তু ২৪ ঘন্টার মধ্যে অবস্থা খারাপ হয়ে যেতে পারে। ডায়রিয়া বা বমির কারণে তীব্র পানিশূন্যতা শরীরে তরলের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয় এবং ফুসফুসের সংক্রমণের কারণে নিউমোনিয়া শিশুদের শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত করে। উভয় সমস্যা ২৪ ঘন্টার মধ্যে ঘাতকে রূপ নিতে পারে। 

এই পাঁচটি বিপদ চিহ্ন দেখামাত্রই শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে-

° ২৪ ঘন্টায় ৩ বারের কম প্রস্রাব এবং  চোখ গর্তে ঢোকা।

° দ্রুত শ্বাস (এক মিনিটে ৫০ বারের বেশি) এবং বুকের নিচে গর্ত।

° খেতে না পারা এবং সব বমি করে দেয়া।

° খিঁচুনি বা অচেতন হয়ে পড়া।

° হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া।

ডিসক্লেইমার: এখানে প্রদত্ত তথ্য কেবল সচেতনতার জন্য। আপনার শিশুর যেকোনো সমস্যায় সঠিক চিকিৎসা পেতে শিশু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।

Comments