বিশেষ পোস্ট

নারীর গোপন স্থানের সংক্রমণ সারানোর যত উপায়

 

narir gopon sthane sonkromon er karon o protirodh bangla
গোপন স্থানে সংক্রমণ এড়াতে টকদই খান

নারীদের গোপন স্থানের একটি অত্যন্ত সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা হলো ভ্যাজাইনাল ইনফেকশন (যোনিপথের সংক্রমণ)। সাধারণত যোনিপথে স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হলে অথবা বাইরে থেকে জীবাণু প্রবেশ করলে এই সংক্রমণ হয়ে থাকে। 

নারীর গোপন স্থানে সংক্রমণের ধরন

যোনিপথের সংক্রমণ প্রধানত তিন প্রকার, যথা- ইস্ট ইনফেকশন, ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস ও ট্রাইকোমোনিয়াসিস।

ইস্ট ইনফেকশন: এটি ক্যান্ডিডা অ্যালবিকানস নামক ছত্রাকের অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, ডায়াবেটিস ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে এই সংক্রমণ বেশি হয়।

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস: সাধারণত নারীদের যোনিতে কিছু ভালো ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা গোপন স্থানের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার অতি বৃদ্ধি রোধ করে। কিন্তু কোনো কারণে ভালো ব্যাকটেরিয়া কমে গেলে এবং ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বেড়ে গেলে সংক্রমণ হয়ে থাকে। এটাকে ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস বলে।

ট্রাইকোমোনিয়াসিস: এটি হলো একটি নিরাময়যোগ্য যৌনবাহিত সংক্রমণ। ট্রাইকোমোনাস ভ্যাজাইনালিস নামক অতি ক্ষুদ্র পরজীবীর মাধ্যমে এটি ছড়ায়। অনিরাপদ যৌনমিলনে এই সমস্যা হয়ে থাকে। 

নারীর গোপন স্থানে সংক্রমণের কারণ

যোনিপথের একটি নিজস্ব অম্লীয় পরিবেশ থাকে, যা ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করে। এই পরিবেশের ভারসাম্য ব্যাহত হলে সংক্রমণ হয়ে থাকে। এখানে যোনিপথে সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য কারণগুলো উল্লেখ করা হলো।

অ্যান্টিবায়োটিক সেবন: কোনো কোনো রোগের জন্য উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক খেলে তা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি ভালো ব্যাকটেরিয়াকেও মেরে ফেলে। এর ফলে ছত্রাক সহজেই বংশবৃদ্ধি করে।

হরমোনের পরিবর্তন: গর্ভাবস্থা, জন্মনিরোধক পিল ব্যবহার বা পিরিয়ডের ঠিক আগে শরীরে এস্ট্রোজেন হরমোনের তারতম্যের কারণে গোপন স্থানে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকলে যোনিপথের কোষেও চিনির মাত্রা বাড়ে। এই চিনি ছত্রাকের প্রধান খাদ্য, যা তাদের দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস: দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, পুষ্টিহীনতা বা কোনো রোগের কারণে ইমিউনিটি দুর্বল হলে শরীর সংক্রমণ সৃষ্টিকারী জীবাণুগুলোর সঙ্গে তেমন লড়াই করতে পারে না। ফলে ঘনঘন সংক্রমণ হয়ে থাকে।

ভুল পরিচ্ছন্নতা অভ্যাস: কেমিক্যালযুক্ত বা সুগন্ধি সাবান, বডি ওয়াশ, ভ্যাজাইনাল স্প্রে বা ডুস ব্যবহার করলে নারীদের গোপন স্থানের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকারী স্তর ধ্বংস হয়ে যায়।

আর্দ্রতা ও পোশাক: গরম ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় দীর্ঘক্ষণ ভেজা কাপড় বা ব্যায়ামের পোশাক পরে থাকলে এবং সিন্থেটিক কাপড়ের টাইট অন্তর্বাস পরলে সংক্রমণের প্রবণতা বাড়ে।

নারীর গোপন স্থানে সংক্রমণের লক্ষণ

যোনিপথে সংক্রমণের প্রধান লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে- অস্বাভাবিক স্রাব, তীব্র চুলকানি এবং প্রস্রাব/সহবাসের সময় জ্বালাপোড়া ও ব্যথা। এখানে এই সংক্রমণের সাধারণ ও নির্দিষ্ট লক্ষণগুলি উল্লেখ করা হলো।

° যোনিপথ ও এর আশেপাশে তীব্র চুলকানি।

° যোনিদ্বার লাল হওয়া, ফুলে যাওয়া ও জ্বালাপোড়া করা।

° প্রস্রাবের সময় তীব্র জ্বালাপোড়া করা বা ব্যথা হওয়া।

° শারীরিক সম্পর্কের সময় যোনিপথে তীব্র ব্যথা বা অস্বস্তি।

° ইস্ট ইনফেকশনের ক্ষেত্রে ঘন, সাদা এবং ছানা/দইয়ের মতো স্রাব বের হয় এবং এতে সাধারণত দুর্গন্ধ থাকে না।

° ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিসের ক্ষেত্রে পাতলা, ধূসর বা সাদাটে রঙের স্রাব বের হয় এবং মাছের আঁশটে দুর্গন্ধ বের হয়।

° ট্রাইকোমোনিয়াসিসের ক্ষেত্রে সাধারণত ফেনা জাতীয়, হলদে-সবুজ রঙের স্রাব বের হয় এবং এটি দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে থাকে।

নারীর গোপন স্থানে সংক্রমণ প্রতিরোধের উপায়

যোনিপথের সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রধান উপায় হলো- সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, রাসায়নিক প্রসাধনী পরিহার করা এবং যোনির প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখা। এখানে এই সংক্রমণ প্রতিরোধের কার্যকরী ব্যবস্থাসমূহ উল্লেখ করা হলো।

পরিচ্ছন্নতা: সবসময় যৌনাঙ্গ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও শুকনো রাখুন। ধোয়ার পর সুতি কাপড় বা টিস্যু দিয়ে মুছে নিন।

সুতির অন্তর্বাস: সিন্থেটিক কাপড়ের পরিবর্তে ১০০% সুতির অন্তর্বাস ব্যবহার করুন। খুব বেশি আঁটসাঁট পোশাক পরা থেকে বিরত থাকুন।

পরিষ্কারের নিয়ম: মলত্যাগের পর সবসময় সামনে থেকে পেছনের দিকে (Front to Back) পরিষ্কার করুন। এতে মলদ্বারের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া যোনিপথে আসতে পারে না।

ডিওডোরেন্ট বর্জন: সুগন্ধি সাবান, বডি ওয়াশ, ভ্যাজাইনাল স্প্রে বা ডুস ব্যবহার না করাই ভালো। এগুলো যোনির স্বাভাবিক pH ব্যালেন্স ব্যাহত করে।

খাদ্যাভ্যাস: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় টকদই রাখুন। এতে থাকা ল্যাকটোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়া যোনির স্বাস্থ্য ভালো রাখে। মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার কম খাবেন।

ভেজা পোশাক পরিবর্তন: সাঁতার কাটার পর ভেজা স্যুট বা শরীরচর্চার পর ভেজা পোশাক দ্রুত পরিবর্তন করে ফেলুন। আর্দ্রতায় ছত্রাকের বংশবৃদ্ধি ঘটে।

পিরিয়ডের সময় সতর্কতা: পিরিয়ডের সময় ব্যবহৃত প্যাড বা মেন্সট্রুয়াল কাপ ৬ ঘন্টা পরপর পরিবর্তন করুন। 

রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ: ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। উচ্চ শর্করা ছত্রাক সংক্রমণ বাড়িয়ে দেয়।

অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার: ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করবেন না। অ্যান্টিবায়োটিক গোপন স্থানের উপকারী ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরও নিচের লক্ষণগুলি দেখা দিলে অবহেলা না করে গাইনি ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
° যোনিপথে তীব্র চুলকানি, জ্বালাপোড়া বা লালচে হওয়া।
° অতিরিক্ত সাদা স্রাব বের হওয়া।
° ঘন দইয়ের মতো বা ধূসর-সবুজ রঙের স্রাব বের হওয়া।
° স্রাব থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হওয়া।
° প্রস্রাবের সময় বা সহবাসের সময় ব্যথা ও জ্বালাপোড়া করা।
শেষকথা: গোপন স্থানের স্বাস্থ্য বজায় রাখা কোনো লজ্জার বিষয় নয়, এটি সাধারণ শারীরিক সুস্থতারই একটি অংশ। সঠিক পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই আপনাকে এই অস্বস্তিকর সমস্যা থেকে মুক্ত রাখতে পারে।
ডিসক্লেইমার: এখানে প্রদত্ত তথ্য কেবল সচেতনতার জন্য, চিকিৎসা নয়। কোনো সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

Comments