বিশেষ পোস্ট

ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে পাঁচ সমস্যা

 

smartphone laptop tab computer related problems bangla
ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে ঘাড় ব্যথা

বর্তমান যুগে স্মার্টফোন এবং ল্যাপটপ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অফিসিয়াল কাজ, পড়াশোনা থেকে শুরু করে বিনোদন- সবখানেই স্ক্রিনের আধিপত্য। কিন্তু দীর্ঘসময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা আমাদের শরীরে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলা হচ্ছে- ডিজিটাল লাইফস্টাইল ডিজিজ। দীর্ঘসময় ধরে ভুল ভঙ্গিতে এসব ডিভাইস ব্যবহারের ফলে অজান্তেই শরীরে বাসা বাঁধছে নানা জটিল রোগ। এখানে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার জনিত পাঁচটি সমস্যা এবং তা থেকে পরিত্রাণের উপায় আলোচনা করা হলো।

ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার জনিত সমস্যা

১। চোখের সমস্যা: আমাদের চোখ স্বাভাবিক অবস্থায় মিনিটে ১৫-২০ বার পলক ফেলে। কিন্তু যখন আমরা স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি, তখন পলক পড়ার হার কমে মাত্র ৫-৭ বার হয়। এর ফলে চোখ শুষ্ক হয়ে যায়। এটাকে ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বলে। এটাকে কম্পিউটার ভিশন সিন্ড্রোমও বলা হয়। 

উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হলো- চোখ চুলকানো বা খসখস করা, পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া, চোখ ও মাথায় ব্যথা, চোখ জ্বালা, আলোতে তাকাতে কষ্ট এবং ঝাপসা দেখা।

সমাধান: ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলুন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্মার্টফোন বা ল্যাপটপে কাজ করার পর ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে দেখুন। স্ক্রিন থেকে চোখের দূরত্ব অন্তত ২০-২৬ ইঞ্চি রাখুন। চিকিৎসকের পরামর্শে নীল আলো প্রতিরোধী চশমা ব্যবহার করতে পারেন।

২। টেক্সট নেক ও মেরুদণ্ডের ক্ষতি: স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তাকার সময় আমরা সাধারণত ঘাড় সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখি। এতে ঘাড়ে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। আমরা যখন সোজা থাকি, তখন আমাদের ঘাড়ের ওপর মাথার ওজন থাকে প্রায় ১০-১২ পাউন্ড। কিন্তু যখন আমরা স্মার্টফোন দেখার জন্য ঘাড় ৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত নিচু করি, তখন ঘাড়ের ওপর চাপের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৬০ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে ঘাড়, পিঠ ও কাঁধে তীব্র ব্যথা ও মাংসপেশি শক্ত হয়ে যেতে পারে। এটাকে টেক্সট নেক সিন্ড্রোম বলে। এটাকে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে মেরুদণ্ডের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। 

সমাধান: স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় হাতটি চোখের স্তরে (Eye Level) তুলে ধরুন, ঘাড় বাঁকাবেন না। ল্যাপটপের নিচে স্ট্যান্ড বা কিছু বই রেখে স্ক্রিনটি চোখের সমান্তরালে নিয়ে আসুন। প্রতি ৩০ মিনিট পরপর উঠে দাঁড়ান এবং ঘাড় ও কাঁধ পেছনের দিকে ঘুরিয়ে হালকা স্ট্রেচিং করুন।

৩। কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম: স্মার্টফোন ও কম্পিউটার অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম হতে পারে। স্মার্টফোনে অনবরত টাইপ করা এবং একটানা মাউস/কিবোর্ড ব্যবহারের কারণে হাতের কবজির স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে। এর ফলে হাত ও আঙুলে ব্যথা হতে পারে, ঝিমঝিম করতে পারে, অবশ হতে পারে এবং রাতে ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। এই সমস্যাকে কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম বলে।

সমাধান: টাইপ করার সময় কবজি সোজা রাখুন। আরামদায়ক মাউস ও কিবোর্ড ব্যবহার করুন। প্রতি ৩০ মিনিট পরপর হাত ও আঙুল স্ট্রেচিং বা হালকা ব্যায়াম করুন। রাতে ঘুমানোর সময় কবজি সোজা রাখতে রিস্ট স্প্লিন্ট ব্যবহার করতে পারেন। স্মার্টফোনে বড় মেসেজ টাইপ করার চেয়ে ভয়েস টাইপিং ফিচার ব্যবহারে অভ্যস্ত হোন। 

৪। ইনসমনিয়া: ডিজিটাল ডিভাইস ঘুমের বারোটা বাজাতে পারে। হতে পারে ইনসমনিয়া (নিদ্রাহীনতা)। স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে নীল আলো নির্গত হয়। এই আলো আমাদের মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্রন্থিকে বিভ্রান্ত করে এবং ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন তৈরিতে বাধা দেয়। এর ফলে ইনসমনিয়া হয়। 

উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হলো- বিছানায় শোয়ার পরও ঘন্টার পর ঘন্টা ঘুম না আসা, রাতে ঘনঘন ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং সকালে ঘুম থেকে উঠার পরও তীব্র ক্লান্তি বোধ করা। 

সমাধান: ঘুমানোর অন্তত এক ঘন্টা আগে সব ধরনের ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন। সন্ধ্যার পর ডিভাইসে নাইট শিল্ড বা আই কমফোর্ট মোড ব্যবহার করুন। বিছানায় স্মার্টফোন নেয়ার অভ্যাস পরিহার করুন। প্রয়োজনে অ্যালার্ম ঘড়ি ব্যবহার করুন। ঘুমানোর আগে বইপড়া বা লেখালেখির অভ্যাস করতে পারেন।

৫। মানসিক সমস্যা: ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার কেবল শরীর নয়, আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকেও ধ্বংস করছে। এর মধ্যে দুটি আধুনিক মানসিক সমস্যা হলো- নোমোফোবিয়া (Nomophobia) এবং ফ্যান্টম ভাইব্রেশন সিন্ড্রোম (Phantom Vibration Syndrome)।  নোমোফোবিয়া হলো মোবাইল ফোন কাছে না থাকা, নেটওয়ার্কের বাইরে যাওয়া বা ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার তীব্র এবং অযৌক্তিক ভয়। এটি মূলত একটি আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যার পূর্ণ রূপ হলো- No Mobile Phone Phobia. অন্যদিকে ফ্যান্টম ভাইব্রেশন সিন্ড্রোম হলো- পকেট বা ব্যাগে ফোন ভাইব্রেট বা রিং না হওয়া সত্ত্বেও মনে হওয়া যে ফোন বাজছে। 

সমাধান: দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় 'No Phone Zone' ঘোষণা করুন, যেমন- খাবার টেবিলে বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়। সোশ্যাল মিডিয়ার অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখুন, যাতে বারবার ফোন চেক করতে না হয়। রাতে ফোন বিছানার বাইরে রাখুন। সপ্তাহে অন্তত একদিন কিছু ঘন্টার জন্য প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার অভ্যাস করুন।

শেষকথা

প্রযুক্তি খারাপ না, এর অপব্যবহারই খারাপ। প্রযুক্তি ছাড়া জীবনযাপন সম্ভব নয়, কিন্তু এটাকে বস বানিয়ে ফেললে সমস্যা। এটাকে কাজে লাগিয়ে আমরা এগিয়ে যাব, কিন্তু স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে নয়। সচেতনতা ও নিয়মানুবর্তিতাই পারে ডিজিটাল মহামারি থেকে রক্ষা করতে। আজই আপনার স্ক্রিন টাইম কমিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ বাড়ান। তাহলে শারীরিক ও মানসিক উভয়ক্ষেত্রেই সুস্থ থাকবেন।

Disclaimer: এখানে প্রদত্ত তথ্য কেবল সচেতনতার জন্য, চিকিৎসা নয়। কোনো সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

Comments