বিশেষ পোস্ট

এসি ব্যবহারে যত স্বাস্থ্য সমস্যা

ac bebohar jonito shastho somossa bangla
একটি এসি রুম
(ছবিটি প্রতীকী)

সারাদিন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (Air Conditioner - AC) পরিবেশে কাটানো বর্তমান আধুনিক জীবনযাত্রার একটি সাধারণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অফিস হোক কিংবা বাসা, গরম থেকে বাঁচতে আমরা দিনের সিংহভাগ সময় এসির মধ্যেই কাটাই। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম এই ঠান্ডা আবহাওয়া শরীরে সাময়িক আরাম দিলেও দীর্ঘ সময় এসিতে থাকলে মানবদেহের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।

সারাদিন এসিতে থাকলে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়ার ফলে ত্বকের শুষ্কতা, পানিশূন্যতা ও শ্বাসকষ্টের মতো স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। এখানে দীর্ঘসময় এসি রুমে থাকার ফলে যেসব সমস্যা হতে পারে তা উল্লেখ করা হলো।

ত্বক ও চোখের শুষ্কতা: এসি ঘরের বাতাস থেকে আর্দ্রতা শুষে নেয়। দীর্ঘক্ষণ এই পরিবেশে থাকলে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ও আর্দ্রতা শুকিয়ে যায়। ফলে ত্বক রুক্ষ, খসখসে ও ফ্যাকাশে হয়ে যায়। এমন চলতে থাকলে ত্বকে অকালেই বলিরেখা দেখা দেবে বা বয়সের ছাপ পড়বে।

এসির বাতাসে চোখের পানি শুকিয়ে যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ড্রাই আই সিন্ড্রোম বলা হয়। এর ফলে চোখে জ্বালাপোড়া, চুলকানি, লালচে ভাব এবং দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। যারা কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করেন তাদের ঝুঁকি আরো বেশি।

পানিশূন্যতা:  ঠান্ডা পরিবেশে পিপাসা কম লাগে। তাই আমরা স্বাভাবিকের তুলনায় কম পানি পান করি। অন্যদিকে এসির শুষ্ক বাতাস শরীর থেকে দ্রুত পানি টেনে নেয়। এই দুই কারণে শরীর তীব্র ডিহাইড্রেশনের শিকার হয়, যার প্রভাব কিডনি ও পরিপাকতন্ত্রের ওপর পড়ে।

শ্বাসকষ্ট ও সাইনাসের সমস্যা: এসি রুমের বাতাস সবসময় ঘরের ভেতরেই ঘুরপাক খায়। বাইরে থেকে নতুন ও বিশুদ্ধ বাতাস আসার সুযোগ থাকে না। ফলে ঘরের ভেতরের জীবাণু, ধূলিকণা ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে ভাসতে থাকে। এছাড়া দীর্ঘদিন এসির ডাক্ট বা ফিল্টার পরিষ্কার না করলে সেখানে লেজিওনেলা নামক মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক জন্মায়। এগুলো নিঃশ্বাসের সাথে ফুসফুসে ঢুকে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, সাইনোসাইটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী হাঁপানি সৃষ্টি করে।

মাইগ্রেন: এসির ঠান্ডা বাতাসে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী নালীগুলো সংকুচিত হয়ে রক্তচাপের তারতম্য ঘটে। এর ফলে ঘনঘন মাথাব্যথা ও মাইগ্রেনের সমস্যা হয়। বদ্ধ বাতাস এবং অক্সিজেনের মৃদু ঘাটতির কারণে মাথা ভারী হয়ে থাকে বা ঝিমঝিম করে।

পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা: একটানা ঠান্ডা বাতাস সরাসরি গায়ে লাগলে শরীরের রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর ফলে রক্তসঞ্চালন ধীর হয়ে যায়। রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ায় মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়। এর ফলে ঘাড়, পিঠ, কোমর এবং হাড়ের জোড়ে বাতের ব্যথা তীব্র রূপ ধারণ করে।

চুলের রুক্ষতা:  ত্বকের মতো মাথার চামড়াও এসির কারণে আর্দ্রতা হারায়। এতে চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে যায়, চুল রুক্ষ ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে এবং চুল পড়ার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

ক্লান্তি ও অলসতা: প্রাকৃতিকভাবে শরীরকে সতেজ রাখতে যে পরিমাণ বিশুদ্ধ অক্সিজেন ও স্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রয়োজন, এসি রুমে তা পাওয়া যায় না। কৃত্রিম ঠান্ডায় শরীরের বিপাকীয় হার কমে যায়, যা মানুষকে ক্লান্ত ও অলস করে তোলে।

সহনশীলতা কমে যাওয়া:  দীর্ঘসময় কৃত্রিম ঠান্ডায় থাকার কারণে আমাদের শরীরের নিজস্ব তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Thermoregulation) অলস হয়ে পড়ে। তাই শরীর প্রাকৃতিক গরম আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে এসি ঘর থেকে হঠাৎ বাইরে বের হলে শরীর তীব্র ধাক্কা খায় এবং জ্বর-সর্দি লেগে যায়। 

ওজন বৃদ্ধি: শরীর যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঠান্ডায় থাকে, তখন শরীরের চর্বি বা ক্যালরি পোড়ানোর গতি ধীর হয়ে যায়। বদ্ধ কক্ষে দীর্ঘক্ষণ অলসভাবে বসে কাজ করা এবং ঘাম কম হওয়ার কারণে ওজন দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

হাঁচি-কাশি: ঠান্ডা-আর্দ্রতাহীন বাতাস শ্বাসনালির শ্লেষ্মা ঝিল্লিকে শুকিয়ে ফেলে। এতে শরীরের প্রাকৃতিক ফিল্টারিং ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়। এর ফলে এসি ঘরে ঢুকলে অনেকেরই অনবরত হাঁচি, কাশি, নাক বন্ধ হওয়া এবং গলা খুশখুশ করার মতো অ্যালার্জিক সমস্যা শুরু হয়।

এসি পরিবেশে সুরক্ষিত থাকার উপায়

এটা ঠিক যে এসি ব্যবহারে কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু কিছু নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চললে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব। এখানে এসি পরিবেশে সুরক্ষিত থাকার উপায়সমূহ উল্লেখ করা হলো।

° এসির তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রির নিচে রাখবেন না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রুমের আদর্শ তাপমাত্রা হলো ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রা মানবদেহের জন্য সহনশীল।

° পিপাসা না পেলেও প্রতি ঘণ্টায় অন্তত এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করুন। এ ছাড়া ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা ভেষজ চা খেতে পারেন।

° এসি রুমে বসার আগে ত্বকে ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। চোখের শুষ্কতা এড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শে আর্টিফিশিয়াল টিয়ার্স বা আই ড্রপ ব্যবহার করতে পারেন।

° দিনে অন্তত ১-২ ঘণ্টার জন্য এসি বন্ধ রাখুন এবং ঘরের জানালা খুলে দিন, যাতে বাইরের বিশুদ্ধ বাতাস ঘরে ঢুকতে পারে এবং ভেতরের দূষিত বাতাস বের হয়ে যায়।

° জীবাণু ও ধুলোবালি মুক্ত বাতাস পেতে প্রতি মাসে অন্তত একবার এসির ফিল্টার পরিষ্কার করুন। বছরে অন্তত একবার পেশাদার টেকনিশিয়ান দিয়ে বাসার এসির ডাক্ট সার্ভিসিং করান। অফিস, শপিংমল ও জিম হলে ৬ মাস পরপর এবং হাসপাতাল, রেস্টুরেন্টে ৩ মাস পরপর।

° এসি রুমে বাতাসের আর্দ্রতা স্বাভাবিক রাখতে একটি হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন। যন্ত্রটি না থাকলে রুমের এক কোণায় একটি বালতিতে খোলা পানি রেখে দিলেও বাতাসের শুষ্কতা কিছুটা কমবে।

° এসির বাতাস সরাসরি গায়ে লাগাবেন না। বসার জায়গা এমনভাবে ঠিক করতে হবে যেন বাতাস সরাসরি মুখে-গলায় না লাগে। অফিসে ডেস্ক চেঞ্জ করতে না পারলে গলায় রুমাল ব্যবহার করুন। এসির সুইং (Swing) অন রাখুন- এতে রুমের সব অংশে বাতাস সমানভাবে পৌঁছবে।

ডিসক্লেইমার: এখানে প্রদত্ত তথ্য কেবল সাধারণ শিক্ষা ও সচেতনতার জন্য। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

Comments